হিন্দু যুবককে চিকেন খিচুরি বলে খাওয়ানো হলো গরুর মাংস

ঢাকাস্থ বসুন্ধরা আবাসিকে অবস্থিত আল্লাহর দান বিরিয়ানী হাউজে এ ঘটনা টি ঘটে, একজন হিন্দু যুবককে চিকেন খিচুরিতে গরু মাংস মিশিয়ে খাওয়ানো হই।

এই বিষয়ে দোকাদারকে প্রশ্ন করলে দোকানদার সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ করতে না পেরে কোনো রকম অনুশোচনা ছাড়াই দোকানের মালিক এক পর্যায়ে বলে বসুন্ধরার ভেতর সকল বিরিয়ানী হাউজের চিকেন খিচুরি নাকি বিফ দিয়েই করা হয়।

বিস্তারিত ঘটনা হিমেল বিশ্বাস এর মুখে-গতকাল দুপুর ১২ঃ১০ নাগাদ ঢাকাস্থ বসুন্ধরা আবাসিকে অবস্থিত আল্লাহর দান বিরিয়ানী হাউজে যাই চিকেন খিচুরি খেতে। দোকানের মালিক যিনি ক্যাশে ছিলেন তাকে জিজ্ঞেস করি, ভাই খিচুরি হবে? তিনি বলেন, ভাই হবে। বিফ না চিকেন? আমিবলি – ভাই ১ টা হাফ চিকেন খিচুরি দেন। দামও জিজ্ঞেস করি সাথে।

তিনি বলেন ১২০ টাকা। আমিও হাত ধুয়ে খেতে বসি। উপরে চিকেন রোস্টটা দেখে বেশ লোভাতুর হয়েই খাচ্ছিলাম। খাওয়া যখন প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ শেষ, তখন খিচুরির ভিতর কেবল দুটি ছোট ছোট মাংসের টুকরো দেখতেই সন্দেহ হয় এবং যিনি আমায় খাবার পরিবেশন করেন তাকে ডেকে জিজ্ঞেস করি, এটি কিসের টুকরো? তিনি ইতস্তত হয়ে বলেন -ভাই! এটিতো গরুর মাংসের টুকরা।

হিন্দু যুবককে চিকেন খিচুরি বলে খাওয়ানো হলো গরুর মাংস
ভাটারা থানা ডিএমপি এর পুলিশ পরিদর্শক গোলাম ফারুক এর সাথে ভুক্তভুগী

আমি সাথে সাথেই হাত ধুয়ে মোবাইল বের করি ও ভিডিও অন করি, রাগান্বিত হয়ে আমি জানতে চাই-সুনির্দিষ্টভাবে চিকেন খিচুড়ি অর্ডার দেওয়ার পরও কেন তারা আমায় বিফ খিচুরি প্রদান করে। সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ করতে না পেরেও কোনো রকম অনুশোচনা ছাড়াই দোকানের মালিক এক পর্যায়ে আমায় বলে বসুন্ধরার ভেতর সকল বিরিয়ানী হাউজের চিকেন খিচুরি নাকি বিফ দিয়েই করা হয়।

চিকেন খিচুরি অর্ডার করলে কেবল বিফ খিচুরি দিয়ে উপরে চিকেন রোস্টটা দেয়া হয়।তার এমন বক্তব্য শুনে আমি আরও রেগে গিয়ে তার সাথে কথা-কাটাকাটি করতে থাকি এবং তাকে তার বক্তব্যের সদুত্তর দিই।

আমি তাদের এমন নেক্কারজনক কৃতকর্মের জন্য আইনি ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানালে, মালিক আমায় জানায় -কি করতে পারেন করেন গিয়ে। সেই মুহূর্তে আমি তার থেকে রশিদ নিয়ে তারই পাশের দোকান মামা বিরিয়ানি হাউজে যাই এবং তাদের রশিদ দেখিয়ে জানতে চাই -চিকেন খিচুরির অর্থ কি? তারাও সেই উত্তর দেই -যা আমারা আমজনতা জানি। চিকেন খিচুরি মানে চিকেন খিচুরি।

সেখানে বিফ আসবে কেন! তার বক্তব্য আমি মোবাইলে ধারণ করে ৯৯৯ এ ফোন দিই।তারা আমায় ৩৩৩ তে ফোন দিয়ে ঘটনাটি জানাতে বলে। ৩৩৩ থেকে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনের বিষয়ে যোগাযোগের জন্য একটি গ্রামীণ ফোন নাম্বার দেয়া হয়। যেটি ভোক্তা অধিকারের ওয়েব পোর্টালে আছে। তাদের থেকে কোনো আইনি সহয়তা না পেয়ে, বরং খারাপ আচরণের স্বীকার হয়ে আমি মনস্থির করি এর শেষ দেখেই ছাড়বো।

 হিন্দু যুবককে চিকেন খিচুরি বলে খাওয়ানো হলো গরুর মাংস

তখন আমি আমার বড় ভাই হিমেল দত্তকে সাথে নিয়ে ভাটারা থানায় যাই এবং সেই সময়ের দায়িত্বরত অফিসার তাহমিনা খুকু ম্যামকে পুরো ঘটনাটি জানাই এবং সাথে ভিডিও চিত্র দেখাই। রশিদ দিই ও খাবারের বাকি অংশটুকু প্রমাণস্বরূপ হস্তান্তর করি।

তিনি আমার বিষয়টি যথাযথ গুরুত্বের সাথে নিয়ে সেই সময় থানায় থাকা ভাটারা থানা, ডিএমপি এর পুলিশ পরিদর্শক গোলাম ফারুক স্যারের কাছে আমায় সাথে করে নিয়ে গিয়ে পুরো ঘটনাটি বর্ণনা করে এবং প্রতারণা ও ধর্মীয়ভাবে মর্যাদা ক্ষুণ্নের বিষটি স্যারের কাছে সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করে।

স্যার ঘটনাটি শুনে খুবই মর্মাহত হয় এবং আমায় সকল ধরনের আইনি সহায়তা প্রদানের আশ্বাস দেয়। আরও উল্লেখ্য, তিনি তৎক্ষনাৎ পুলিশ ফোর্স পাঠায় বসুন্ধরা আবাসিকের সেই আল্লাহর দান বিরিয়ানী হাউজে। কিন্তু ততক্ষণে মালিক ব্যাটা পগার পাড়।স্যার আময়া নিশ্চয়তা দিয়ে বলে,যেমন করেই হোক রাতের মধ্যে তাদের ধরে আনবে এবং বলে বাসায় গিয়ে কিছু খেয়ে নিতে।তিনি আমার ব্যক্তিগত নাম্বার তার মুঠোফোনে সেভ করে রাত ৯ঃ০০ টার ভেতর আমার সাথে যোগাযোগ করবে বলে নিশ্চয়তা প্রদান করে।

আরো-পড়ুনঃ সিসি ক্যামেরা যখন ফিরিয়ে দিল মানিব্যাগ ভর্তি টাকা, এনআইডি যাবতীয় কাগজপত্র

সন্ধ্যা ৮ঃ০০ নাগাদ আমার নাম্বারে ভাটার থানা থেকে কল আসে।বলে -হিমেল, তুমি কি একটু থানায় আসতে পারবা? আমি বলি -স্যার, ১০মিনিটের মধ্যে আসছি। থানায় ঢুকতেই প্রবেশ মুখে আল্লাহর দান বিরিয়ানী হাউজের মালিক ও কর্মচারীদের দেখে এক প্রশান্তির নিশ্বাস ফেলি। গিয়ে জানতে পারি কিছুক্ষণ আগে যখন দোকান খুলা হয়-কর্মচারীকে গ্রেফতার করে মালিক ব্যাটাকে ঘর থেকে বগলতাবা করে নিয়ে আসা হয়েছে।স্যারকে কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা হারিয়ে ফেলি।

স্যারকে কৃতজ্ঞতা পোষণ করতেই বলে উঠে-হিমেল এটা আমার দায়িত্ব। এক মুহূর্ত মনে হয়,বাংলাদেশের সকল পুলিশ অফিসার যদি এমন হত, দেশের চিত্রটাই না কেমন পাল্টে যেত! পরক্ষণেই তাদের প্রত্যেককেই স্যারের রুমে আমার সামনে হাজির করা হয়।ইতিমধ্যেই আমি যে বিষয়টি রাজনৈতিক মহলে ও হিন্দু ধর্মীয় সংগঠনের উচ্চ পর্যায়ে জানিয়েছি তা গোলাম ফারুক স্যার অবগত হয়।

তিনি বলে -হিমেল, তুমি যেমনভাবে ব্যবস্থা নিতে চাও, আমি তেমন ব্যবস্থাই নিব। জেল -জরিমানার বিষয়টিও ভ্রাম্যমাণ আদালতের আইনানুসারে তাদের জানানো হয়। নগদ ১ লক্ষ টাকা অর্থদন্ডসহ জেল। বিরিয়ানী হাউজের মালিকসহ উপস্থিত চারজন অনুরোধ করতে থাকে এবং ভুল হয়েছে বলে বারবার ক্ষমা চাইতে থাকে।তারা স্বীকার করে ওটা আসলেই বিফ মিক্সিং খিচুরি ছিল।

আলাদা করে ঐদিন কোনো খিচুরি ছিল না বিধায় বিফের টুকরোগুলো বেছে নিয়ে কেবল রোস্টটি উপরে দিয়ে তারা আমায় এ খাবার পরিবেশন করে। কিন্তু নিয়তি তাদের হারিয়ে দেয় এবং আমার খাবারে পরে যায় বিফ টুকরো।

এতকিছু সত্ত্বেও আমি মানবিকতার দরুণ তাদের অনুরোধ ও ক্ষমা চাওয়ার দরুণ এবং তারা তাদের ভুল বুঝতে পারার এমন আশ্বাসের দরুণ নিজের অটল অবস্থানের কাছে হেরে যাই এবং ভবিষ্যতে এমন কাজ কখনো করবে কিনা জানতে চেয়ে, গোলাম ফারুক স্যারকে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবো না এবং কোনো অভিযোগ নেই জানিয়ে তাদের ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করি।

আরো-পড়ুনঃ শাহজাদপুর পুলিশের বিরুদ্ধে এক গরু ব্যবসায়ীর টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে

স্যার,তাদের বিরুদ্ধে পরবর্তীতে এমন অভিযোগের বাইরেও কোনোরকম অভিযোগ পেলে কঠোর থেকে কঠোর শাস্তি প্রদানের কথা জানায় ধমকের সুরে। আমার এমন সিদ্ধান্তের পেছনে থানার তাহমিনা খুকু ম্যাম এবং ফারুক স্যারের ভূমিকাই বেশি। তারা মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও আমার বিষয়টির যে মর্যাদা দিয়েছে, সেই দৃষ্টিকোণ থেকে আমিও তাদের ক্ষমা করার সিদ্ধান্তে উপনীত হই ব্যক্তিগত চিন্তা থেকেই।

জানি না,তাদের হৃদয়ে আদৈও এ ঘটনাটি প্রভাব ফেলবে কি না! কিংবা এটা যে কেবল ভুল নয়, একটি চরম অন্যায় সেটি বুঝবে কি না! কিন্তু আমি তাদের জানাতে চাই, বিদ্বেষে ভালোবাসা বাড়ে না,দ্বন্দ্বে দ্বন্দ্ব বাড়ে। ভালোবাসা হচ্ছে পৃথিবীর একমাত্র জিনিস যেটি দিলে মানুষের কোনো ক্ষতি হয় না।

আরো-পড়ুনঃ মেয়েদের ভ্রমণের ইচ্ছা জাগিয়ে তুলতে চাই, ওয়ান্ডার উইমেনের প্রতিষ্ঠাতা সাবিরা মেহেরিন

বরং সে ভাগে, ভাগের পরিমাণটা আরও বাড়ে। হিমেল বিশ্বাস নামটির বাইরেও পরিচয় দিতে গর্ববোধ করি এই বলে- আমি একজন অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা,স্বপ্নদ্রষ্টা একটি সম্প্রীতির বাংলাদেশের।

  • ঘটনার স্থান- আল্লাহর দান বিরীয়ানী হাউজ।
  • আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কারণ- প্রতারণা ও ধর্মীয় মর্যাদা ক্ষুণ্ণ।
  • ঘটিত ঘটনার সময়কাল- আনুমানিক দুপুর ১২ঃ১০(১৯.১.২০২০).
Facebook Comments