অভিশংসন বিচারে ট্রাম্পের ‘অপরাধের’ সবিস্তার বিবরণ

সভাপতির আসনে মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস। জুরির আসনে ১০০ জন সিনেটর। বুধবার ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিশংসন বিচারের দ্বিতীয় দিনে মোট আট ঘণ্টা ডেমোক্রেটিক ম্যানেজাররা আপাতভাবে এঁদের সামনে প্রেসিডেন্টের ‘অপরাধের’ বিবরণ দেন। এ সময় তাঁদের মাথায় ছিল দেশের টিভি দর্শক।

রিপাবলিকান আপত্তির মুখে ট্রাম্পকে ক্ষমতা থেকে অপসারিত করা যাবে না, এ কথা ডেমোক্র্যাটরা জানেন। কিন্তু ট্রাম্পের অপরাধের পূর্ণ বিবরণ প্রকাশ করা গেলে ২০২০ সালের নির্বাচনের ফলাফল প্রভাবিত করা সম্ভব হবে।

সে কারণে নিজেদের উপস্থাপনাকে নাটকীয় ও আকর্ষণীয় করে তুলতে সব সুযোগ ব্যবহার করেন ডেমোক্রেটিক ম্যানেজাররা। ভিডিও ক্লিপ ও স্লাইডের যে বুদ্ধিদীপ্ত ব্যবহার তাঁরা করেন, এতে রিপাবলিকান নেতাদের কেউ কেউ প্রশংসা করতে বাধ্য হন। এঁদের একজন ট্রাম্পের কট্টর সমর্থক হিসেবে পরিচিত ফ্লোরিডার কংগ্রেসম্যান ম্যাট গেটস।

বুধবার ডেমোক্র্যাটদের উপস্থাপনায় মুগ্ধ হয়ে গেটস বলেন, মনে হচ্ছিল যেন ক্যাবেল টিভির খবর দেখছি। এর তুলনায় ট্রাম্পের পক্ষে উপস্থিত কৌঁসুলিরা যে বক্তব্য দেন, তা দেখে মনে হয়েছে—এঁরা বোধ করি অষ্টম শ্রেণির ছাত্র।

পরে নিজের কথা সংশোধন করে গেটস বলেন, না ঠিক হলো না। অষ্টম শ্রেণির ছাত্ররা এর চেয়ে অনেক ভালোভাবে বক্তব্য উপস্থাপনে সক্ষম।

মঙ্গলবার বিচারের প্রথম দিন গৃহীত নীতিমালা অনুসারে প্রতিনিধি পরিষদের পক্ষে সাতজন ডেমোক্রেটিক ম্যানেজার ও ট্রাম্পের পক্ষে আটজন কৌঁসুলি ২৪ ঘণ্টা করে সময় পাবেন নিজেদের বক্তব্য প্রদানে। আট ঘণ্টা করে তিন দিনে তাঁরা প্রত্যেকে নিজেদের বক্তব্য দেবেন।

ডেমোক্র্যাটরা প্রথম দিন থেকেই নতুন সাক্ষী ও অতিরিক্ত নথিপত্র উপস্থাপনের দাবি তুলেছেন। ট্রাম্পের নির্দেশে অভিশংসন তদন্তের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এমন অনেক কর্মকর্তাকে সাক্ষী দিতে দেওয়া হয়নি।

কংগ্রেস হোয়াইট হাউসের কাছে যেসব নথিপত্র দাবি করেছে। কিন্তু নির্বাহী অধিকারের যুক্তি তুলে ট্রাম্প তার অধিকাংশই অবমুক্ত করতে অস্বীকার করেছেন।

ডেমোক্রেটিক ম্যানেজাররা যুক্তি দেখান, ট্রাম্প যে কংগ্রেসের কাজে বাধা সৃষ্টি করেছেন, এটি তার বড় প্রমাণ। যে দুই কারণে ট্রাম্প অভিশংসিত হয়েছেন, তার একটি হলো কংগ্রেসের কাজে বাধা। অন্য কারণ ক্ষমতার অপব্যবহার।

অতিরিক্ত সাক্ষী ও নথিপত্রের যে দাবি ডেমোক্র্যাটরা উত্থাপন করেন, বিচারের প্রথম দিনই রিপাবলিকান সিনেটরদের সম্মিলিত আপত্তির মুখে তা বাতিল হয়ে যায়।

তা সত্ত্বেও বুধবার অভিযোগনামা পেশের সময় ডেমোক্রেটিক ম্যানেজাররা পুনরায় বারবার নতুন সাক্ষী ও নথিপত্রের দাবি তুলে ধরেন। তাঁদের যুক্তি, গত মাসে প্রতিনিধি পরিষদ কর্তৃক ট্রাম্পকে অভিশংসিত করার পর আরও নতুন নতুন তথ্য উন্মোচিত হয়েছে।

প্রেসিডেন্টের সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন বলেছেন, সিনেটের সমন পেলে তিনি সাক্ষ্য দিতে প্রস্তুত। ডেমোক্র্যাটরা আশা করছে, উভয় পক্ষের বক্তব্য পেশের পর অন্তত চারজন রিপাবলিকান সিনেটরের সমর্থনে তাঁরা নতুন সাক্ষী ডাকার সুযোগ পাবেন। এই দাবি গৃহীত হলে তাঁরা বোল্টনসহ ট্রাম্প প্রশাসনের আরও তিনজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে সাক্ষ্য দিতে সমন পাঠাতে আগ্রহী।

ডেমোক্র্যাটদের এই দাবি যদি গৃহীত হয়, তাহলে রিপাবলিকানরাও তাঁদের পছন্দমতো সাক্ষীর জন্য সমন পাঠাতে পারে। সাক্ষী হিসেবে তাঁরা সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও তাঁর ছেলে হান্টার বাইডেনকে ডেকে পাঠাতে পারেন।

বাইডেন নিজে বলেছেন, এটি একটি শাসনতান্ত্রিক বিচার। এই বিচারে তাঁর কোনো ভূমিকা নেই। ফলে তিনি সমন পেলেও সাক্ষ্য দিতে আসবেন না।

ডেমোক্রেটিক নেতারাও বলেছেন, সাক্ষী প্রশ্নে ‘সওদা’ করার কোনো ইচ্ছা তাঁদের নেই।

আমেরিকার ইতিহাসে তৃতীয়বারের মতো অনুষ্ঠিত এই অভিশংসন বিচারের লক্ষ্য—কংগ্রেস কর্তৃক অভিশংসিত হওয়ার পর ট্রাম্পকে ক্ষমতা থেকে অপসারণ করা হবে কি না, সে সিদ্ধান্ত গ্রহণ। সিনেটের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য সম্মত হলে ট্রাম্পকে অপসারণ করা যাবে।

বিচারের প্রথম দুই দিনের বক্তব্য-পাল্টা বক্তব্যে অপসারণের পক্ষে-বিপক্ষে দুই পক্ষের অবস্থান পরিষ্কার হয়েছে।

আরও পড়ুন: ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়ার ১৫তম বিবাহবার্ষিকী উদযাপন করেছে হোয়াইট হাউজ

ট্রাম্প প্রশাসনের যেসব কর্মকর্তা ইতিপূর্বে সাক্ষ্য দিয়েছেন, ডেমোক্র্যাটরা তাঁদের বক্তব্য ব্যবহার করে এ কথা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন যে,২০২০ সালের নির্বাচনে নিজের জন্য সুবিধা আদায়ের লক্ষ্যে ট্রাম্প ইউক্রেনের জন্য কংগ্রেস কর্তৃক অনুমোদিত প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলার সামরিক সাহায্য আটকে দেন।

জো বাইডেন ও তাঁর ছেলে হান্টারের কার্যকলাপের ওপর তদন্ত শুরুর ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত এই অর্থ বরাদ্দে তিনি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।

ডেমোক্র্যাটদের যুক্তি, ২০২০ সালের নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী বাইডেনকে কালিমাযুক্ত করার জন্য ট্রাম্প সামরিক সাহায্য ব্যবহার করে ইউক্রেনের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন। এটি প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর ক্ষমতার অপব্যবহার।

আরও পড়ুন: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিশংসন মামলার বিচারকাজে, বিকল্প সাক্ষী’র প্রস্তাব নাকচ

অন্যদিকে প্রেসিডেন্টের আইনজীবীরা বলছেন, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আইনভঙ্গের কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উত্থাপিত হয়নি। ইউক্রেনে ব্যাপক দুর্নীতির বিরুদ্ধে তদন্তের জন্য চাপ সৃষ্টির জন্য তিনি সামরিক সাহায্য সাময়িকভাবে স্থগিত করেন, যথাসময়ে সে স্থগিতাদেশ তুলেও নেন। এর বদলে তিনি কোনো সুবিধা দাবি করেননি।

সর্বশেষ জাতীয় জনমত জরিপ অনুসারে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১ শতাংশ মানুষ ট্রাম্পকে অভিশংসিত করা ও ক্ষমতা থেকে অপসারণের পক্ষে মত দিয়েছে। সিএনএন কর্তৃক গৃহীত এই জনমত অনুসারে ৬৯ শতাংশ আমেরিকান অভিশংসন বিচারে সহায়ক হয়, এমন অতিরিক্ত সাক্ষী ও নথিপত্র হাজির করার পক্ষে মত দেয়।

Facebook Comments