মেঘের কোলে সমুদ্রের নীলে জাবি লোকপ্রশাসন পরিবার

বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাসরুমের বাইরে বাংলার অপরূপ প্রকৃতি জীবনবোধ সম্পর্কে জানতে ও উপভোগ করতে শেখায়। এই শেখার জন্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন পরিবার প্রতিবছরের মতো এবারও শিক্ষাসফরে গিয়েছিলাম পাহাড়ের সবুজ অরণ্যের মধ্যে মেঘের কোলে ভাসতে।

সমুদ্রের নীল জলরাশির ঢেউকে আপন করে নিতে বান্দরবান, কক্সবাজার ও সেন্ট মার্টিন দ্বীপে গিয়েছিলাম শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।

বিভাগের চেয়ারম্যান ড. জেবউননেসার তত্ত্বাবধানে চারজন শিক্ষকসহ আমরা ৪৪ জন শিক্ষার্থী ৪ জানুয়ারি রাতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বান্দরবান রওনা দিই। যখন পৌঁছাই, তখন রাতের আঁধার কেটে পাহাড়ের সবুজ বুকে কেবল ফুটতে শুরু করেছে ভোরের আলো।

আরও পড়ুনঃ মুরগির মেটে বা লিভার খাওয়া স্বাস্থ্যের পক্ষে উপকারি না ক্ষতিকর? জেনে নিন

সকাল সকাল নাশতা করে আগে থেকে রিজার্ভ করে রাখা চান্দের গাড়িতে উঠে পড়ি, উদ্দেশ্য মেঘ–সূর্যের খেলা দেখা। বান্দরবানের আঁকাবাঁকা রাস্তা ধরে নরম কুয়াশার চাদর ভেদ করে পাহাড়ের গা বেয়ে যতই ওপরে উঠছিলাম, সোনালি সূর্য ততই স্পষ্ট হচ্ছিল। নিচের দিকে তাকালেই পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে সাদা মেঘের ভেলা।

বান্দরবানের নীলগিরি, নীল আঁচল যেন সবুজ পাহাড় ও নীল আকাশে সাদা মেঘের পশলা সাজিয়ে বসে আছে, সেই মেঘে সোনালি রোদের আলোর ঝটকায় যে বিক্ষিপ্ত সৌন্দর্য চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, তা মনের মর্মে প্রবেশ করে।

দুপুর পর্যন্ত ভেসে বেড়ানো মেঘের নিখাদ সৌন্দর্যে ডুবে থেকে বিকেলে আমরা যাই স্বর্ণমন্দিরে, এ পবিত্র স্থানেই রয়েছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৌদ্ধমন্দির। পাহাড়ের ওপরে এ মন্দিরে এক স্নিগ্ধ পবিত্রতায় মনকে আচ্ছন্ন করে ফেলে।

পরের দিন সকালে বান্দরবানের সবুজ পাহাড়ের মায়া কাটিয়ে সমুদ্রের টানে চলে আসি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে। অর্ধদিনের ভ্রমণক্লান্তি কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের ঢেউয়ের গর্জনে নিমেষেই উবে যায়। সমুদ্রের হাওয়ার গভীরে কান পেতে জীবনের স্পন্দনকেই নতুন করে শুনতে পাই।

আমাদের স্টাডি ট্যুরের চতুর্থ ও পঞ্চম দিন কাটে দেশের সর্বদক্ষিণের স্থান ও অন্যতম সুন্দর দ্বীপ সেন্ট মার্টিনে। টেকনাফ থেকে যখন আমাদের জাহাজ নাফ নদীর বুক চিরে সেন্ট মার্টিন দ্বীপের দিকে রওনা দেয়, তখন আমাদের পিছু নেয় পাখা মেলে উড়তে থাকা একঝাঁক মায়াবী গাঙচিল।

সমুদ্র ও গাঙচিলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে চলে আসি নীল সৌন্দর্যের নগরী সেন্ট মার্টিন দ্বীপে। চারদিকে বঙ্গোপসাগরের বিশাল নীল জলরাশি আর তার মধ্যে ছবির মতো সুন্দর ও নয়নাভিরাম এই প্রবালদ্বীপ। শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের সঙ্গে দ্বীপের সৌন্দর্য উপভোগ করি, আড্ডা–গানে মুখরিত ছিলাম পুরোটা সময়।

সেন্ট মার্টিন দ্বীপের উত্তরাংশে পরিচ্ছন্ন অভিযান। ছবি: লেখক
সেন্ট মার্টিন দ্বীপের উত্তরাংশ

বিচ ফুটবল ম্যাচে মনির উদ্দিন শিকদার ও সাইফ স্যারও আমাদের সঙ্গে অংশ নেন, সমুদ্রে নামেন। এরপর বিকেলটা কাটে হ‌ুমায়ূন আহমেদ স্যারের ‘সমুদ্র বিলাস’–এর সামনে। পড়ন্ত বিকেলে নীল পানির এপার থেকে সেদিনের জন্য সূর্যকে বিদায় জানানোর মুহূর্ত।

সে এক নৈসর্গিক সৌন্দর্য আর সূর্যও যেন একটু হেসে পুবের আকাশে একফালি চাঁদ রেখে বিদায় নিল। চাঁদনি রাতে খোলা আকাশের নিচে সমুদ্রতীরে বারবিকিউ এবং শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের জন্য আলাদা আলাদা গেমের আয়োজন শিক্ষাসফরের রাতের আনন্দকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

আরও পড়ুনঃ শুরু হচ্ছে ট্রেসেমে বাংলাদেশ ফ্যাশন উইক ২০২০, স্পনসর নিউ ইয়র্ক ট্রেসেমে

চাঁদের আলোয় সেন্ট মার্টিন দ্বীপ তার লুকিয়ে রাখা মায়াবী সৌন্দর্য সমুদ্রের নীল পানির ঢেউয়ে ভাসিয়ে এনে পর্যটকদের মনের তীরে নোঙর ফেলে। আমরা ছিলাম ভাগ্যবান। পূর্ণিমা রাতের সেন্ট মার্টিনও উপভোগ করতে পেরেছি।

সে রাতে হেঁটে সাইফ স্যারের সঙ্গে সেন্ট মার্টিন উপভোগ, মাঝেমধ্যে গলা ছেড়ে গান আর সেই গানের সঙ্গে সমানতালে সুর তুলে সৈকতে আছড়ে পড়া মিষ্টি সুন্দর ঢেউয়ের সুরলহরি যেন এক অন্য পরিবেশ। পরদিন সকালে ট্রলারে করে দেখতে যাই প্রবালের চাদরে মোড়ানো স্বচ্ছ পানির ছেঁড়া দ্বীপে। এ অংশের সৌন্দর্য একটু ভিন্ন।

ছেঁড়া দ্বীপের প্রধান বৈশিষ্ট্য প্রকৃতির খেয়ালে চারদিকে হাজারো ছোট–বড় প্রবাল বিছানো। এখানে এলে নাকি ডাব খাওয়া বাধ্যতামূলক, তাই সাইফ স্যারের কাছ থেকেই ডাবের ট্রিট নিয়ে নিলাম।

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে গোধূলিতে চোখজুড়ানো রঙের সৌন্দর্য। ছবি: লেখক
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে গোধূলিতে

শিক্ষাসফর শুধু উপভোগের জন্য নয়, শিক্ষণীয় ও ভ্রমণের স্থানকে কিছু দিয়েও আসতে হয়। আর তাই তো বিভাগের চেয়ারম্যানের নির্দেশে আমরা সবাই হাত দিলাম হোটেলের সামনে সৈকতে পড়ে থাকা পলিথিন ও প্লাস্টিকের বোতল পরিষ্কারের কাজে।

ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সম্পূর্ণ জায়গা পরিষ্কার করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু আমরা সচেতন হলেই যে ভ্রমণের স্থান সুন্দর থাকবে, সে শিক্ষা তিনি আমাদের দিয়েছেন এই উদ্যোগের মাধ্যমে। পর্যটক হিসেবে আমাদের আরও সচেতন হওয়া দরকার, তা না হলে আমাদের উপভোগ হবে প্রকৃতি ধ্বংসের কারণ।

প্রকৃতি যেন রূপের পসরা সাজিয়ে বসে আছে ছেঁড়া দ্বীপ। ছবি: লেখক
প্রকৃতি যেন রূপের পসরা সাজিয়ে বসে আছে ছেঁড়া দ্বীপ

স্থায়ীভাবে পাহাড় ও সমুদ্রের স্বর্গীয় সৌন্দর্যের মধ্যে ডুবে থাকার কোনো অবকাশ নেই, গুনে গুনে অসাধারণ পাঁচটি দিন পার করে এবার ক্যাম্পাসে ফিরতে হবে।

৯ জানুয়ারি ফেরার সময় প্রকৃতির সঙ্গে পথের দূরত্ব যতই বাড়ছিল, মনের কোণে এই কদিনের উপভোগ্য ও শিক্ষণীয় সোনালি স্মৃতিগুলো বারবার উঁকি দিচ্ছিল। লোকপ্রশাসন পরিবারের সঙ্গে পাহাড় ও সমুদ্রে আনন্দ–উল্লাসে কাটিয়ে দেওয়া এই পাঁচ দিন আমাদের জীবনের অন্যতম সুন্দর দিন, সে কথা বলতে কোনো দ্বিধা নেই।

সুত্র

Facebook Comments