সাহস জোগাতে হবে

বিশ্বে প্রতি চারজন নারীর মধ্যে একজন জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে কোনো না কোনোভাবে যৌন নির্যাতনের মুখোমুখি হন, যাঁদের একটি বড় অংশই পরবর্তী সময়ে কেবল এই যৌন নির্যাতনের কারণে মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হয়। চিকিৎসা গ্রহণের সময় যৌন নির্যাতনের ঘটনা অনেক সময় ঊহ্যই রয়ে যায়।

যেকোনো ধরনের যৌন নির্যাতনের তাৎক্ষণিক আর দীর্ঘমেয়াদি মানসিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। 

যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়ার প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নারী বা শিশুর দুশ্চিন্তা, উৎকণ্ঠা ও আতঙ্ক দেখা দেয়। নির্যাতনের পরপরই তীব্র মানসিক চাপজনিত সমস্যা বা একিউট স্ট্রেস রিঅ্যাকশনের মতো মানসিক সমস্যা দেখা দিতে পারে।

কিংকর্তব্যবিমূঢ়, অপলক তাকিয়ে থাকা, বিষয়টিকে স্বপ্ন মনে করে অবিশ্বাস করা, অস্থিরতা, দ্বিধাগ্রস্ততা, রাগ করা, আক্রমণাত্মক হয়ে যাওয়া, কান্নাকাটি করা অথবা নিজেকে গুটিয়ে ফেলার মতো ঘটনা ঘটে। অপরাধবোধে ভোগা, নিজেকে শেষ করে ফেলার চিন্তা করা, কখনো কখনো কষ্ট আর দুঃখের বিপরীত আচরণ অর্থাৎ অতি উৎফুল্লতা প্রকাশের চেষ্টাও করে।

আর-পড়ুনঃ বৃহন্নলা মায়ের মাতৃত্বের গল্প বলতে আসছে ‘ফিরকি’

নির্যাতনের ঘটনা ঘটার কয়েক দিন পর থেকে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে প্রতিক্রিয়াগুলো একটু পাল্টাতে থাকে। ভীতসন্ত্রস্ত, অতি সতর্ক ভাব, বিরক্তি, রাগান্বিত ভাব এবং ঘুম কমে যেতে থাকে। নির্যাতনের স্মৃতি বারবার মনে পড়া, কান্নাকাটি করা, নেশাদ্রব্য গ্রহণ বা আত্মহত্যার চেষ্টা করে অনেকে। 

নির্যাতনের দীর্ঘ সময় পরে পোস্ট–ট্রম্যাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার, বিষণ্নতা, আর ব্যক্তিত্বের সমস্যা (পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার) দেখা দিতে পারে। এ পর্যায়ে নির্যাতনের দুঃসহ স্মৃতি বারবার মনে পড়া, নির্যাতন–সংশ্লিষ্ট উদ্দীপক (স্থান, সময়, ছবি, ঘটনার বিবরণ)

এড়িয়ে চলা, নিজের ক্ষতি করার প্রবণতা, আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়া, সব কাজে উৎসাহ হারিয়ে ফেলে। মেয়েশিশুরা পুরুষ দেখলে ভয় পাওয়া, কোথাও যেতে না চাওয়া, হঠাৎ বিছানায় প্রস্রাব করা শুরু করতে পারে।

আর-পড়ুনঃ পঙ্গু বলে ফেলে দিয়েছিলেন বাবা-মা! সেই তরুণীর মাসিক আয় এখন ৫০ লাখ!

নির্যাতন ঘটনা ঘটে গেলে করণীয়

যেকোনো নারী যৌন নিপীড়নের শিকার হতে পারেন। নির্যাতনের শিকার নারীর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিও তাঁকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলতে পারে। তাই সামাজিক আচরণের পরিবর্তন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কোনোভাবেই নিপীড়নের শিকার হওয়ার জন্য মেয়েটিকেই উল্টো দায়ী করা যাবে না।

একা না রেখে পাশে থেকে সাহস দিতে হবে। বিষয়টি চেপে যাওয়া বা গোপন রাখার কথা বলা যাবে না। মা-বাবাকে শক্ত হতে হবে, আইনি সহায়তা নিয়ে নির্যাতককে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। সমবেদনা বা করুণা নয়, সমমর্মিতা প্রকাশ করতে হবে, প্রচারমাধ্যমগুলোকে দায়িত্বশীল হতে হবে। নির্যাতনের শিকার ব্যক্তির শারীরিক চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক চিকিৎসাও করাতে হবে।

শৈশব থেকেই যদি মনের স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া যায়, নারী-পুরুষ বৈষম্যহীন পারিবারিক কাঠামো তৈরি করা যায়, নারীর প্রতি সম্মানবোধ তৈরির নৈতিক শিক্ষা দেওয়া যায়, তাহলে একদিকে যেমন যৌন নির্যাতনের ঘটনা কমে আসবে, তেমনি নির্যাতনের শিকার নারী নিজেও মানসিক সমস্যায় ভুগবেন না।

আহমেদ হেলাল, সহযোগী অধ্যাপক, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, ঢাকা


সুত্র

Rating: 5 out of 5.
Facebook Comments