Protests by neo-Nazi groups in the United States

ফ্লোরিডার অধিবাসী ২৩ বছর বয়সী নৃবিজ্ঞানের ছাত্র ম্যাক কাপেতানোভিচ। তাঁর জানার কৌতূহল হলো লকডাউনে আটকা মানুষ কীভাবে সময় কাটায়, দেখবে। এ সময় জীবন একাকিত্ব, একঘেয়েমি ও বৈচিত্র্যহীনতায় বিষিয়ে উঠেতে পারে।

তাই মানুষ অনলাইন-নির্ভর বিনোদনে ঝুঁকবে। এটি ছিল তাঁর পূর্বধারণা। সুতরাং জানার জায়গা ইন্টারনেট অবশ্যই। আরেক কারণ, ইন্টারনেট সেবাদাতা কোম্পানিগুলো মার্চের মাঝামাঝিতেই রিপোর্ট করেছে যে ইন্টারনেটভিত্তিক বিভিন্ন আলোচনা-গ্রুপ ও ফ্র্যাটার্নিটি বা সমমনা ভ্রাতৃসংঘের কার্যকলাপ সাধারণ সময়ের চেয়ে ১২-১৫ শতাংশ বেড়েছে।

এসব সংঘ-জমায়েতকে সাধারণত হালকা ও চটুল রম্য বিষয়নির্ভর বিনোদনের আখড়া ধরা হয়। তাই তিনি বিষয় ঠিক করলেন, শুধুই হাসি-ঠাট্টা-কৌতুক-মিম-কার্টুনগুলোর ধরন-ধারণ দেখবেন।

দেখা শুরু হলো। অল্প সময়ের মধ্যেই বিনোদনের আড়ালে ভীতিকর একটি গভীর অন্ধকার জগৎও স্পষ্ট হয়ে পড়ল তাঁর চোখে। অনলাইন মাধ্যমকে অবলম্বন করে উগ্র ডানপন্থী সংঘবদ্ধ দলের নতুন সদস্য জোগাড়ের লোভনীয় ফাঁদ, এবং ধর্মীয় বিদ্বেষ ও উগ্রবাদের নতুন ভঙ্গিমায় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা তাঁর নজর এড়াল না।

বলা বাহুল্য, কয়েক বছর আগে ম্যাক নিজেও ফোরচ্যান নামের একটি চ্যাট গ্রুপে ঢুকে উগ্রবাদী সংগ্রহকারীদের প্রতি একরকম আকৃষ্টই হয়ে পড়েছিলেন। গ্রুপ সদস্যদের আলোচনাপদ্ধতি ছিল চিত্তাকর্ষক এবং মগজ ধোলাইয়ের জন্য মোক্ষম। একপর্যায়ে গ্রুপের কাজকর্ম আরও গভীরভাবে বুঝতে গিয়েছিল সে। তখনই তাদের চিন্তার অসংগতি এবং আদর্শিক স্খলনের বিষয়টি তাঁর চোখে পড়েছিল।

ঘটনাটি উল্লেখ করেছে ২৬ মার্চ ২০২০-এর ‘টাইম’ ম্যাগাজিন। একই প্রতিবেদন জানান দিল, ‘লাইফ আফটার হেইট’-এর বিশেষজ্ঞ গবেষক ব্রাড গ্যালোওয়ে একগাদা তথ্য জড়ো করে দেখালেন যে পৃথিবীর নানা প্রান্তে দুর্বল ও প্রান্তিক গোষ্ঠীর ক্ষতি করার জন্য এককাট্টা হচ্ছে বিরোধীরা।

গ্যালাওয়ের বক্তব্য ছিল, ‘এই মুহূর্তে প্রান্তিক মানুষেরা একেবারেই নাজুক অবস্থায় থাকায় সুযোগসন্ধানীরা সমাজে ও গোত্রে বিভক্তি-বিভেদ ঘটানোর চেষ্টা করছে।’ তবে সবচেয়ে আতঙ্ককর তথ্য দিয়েছে ‘দ্য গ্লোবাল টেররিজম ইনডেক্স’। সংস্থাটির গবেষণা মতে, এই বছরের শুরু থেকে মধ্য মার্চ পর্যন্ত উগ্রবাদী কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক সময়ের ৩২০ শতাংশ বেড়েছে।

একই সময়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্কতামূলক নির্দেশনা পাঠিয়েই বিশ্বসমাজকে সাবধান করেছে। নির্দেশনাটির ভাষ্য ছিল, করোনা দুনিয়াজুড়ে উগ্রবাদ বাড়িয়ে দিতে পারে।

মনে রাখা দরকার, সাধারণের কাছে একটি ভুল ধারণা রয়েছে যে ‘উগ্রবাদ’ মানে ধর্মভিত্তিক উগ্রপন্থা। উগ্রপন্থার সঙ্গে ধর্মের বিন্দুমাত্র সংযোগ না-ও থাকতে পারে। কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু করার যেকোনো এককাট্টা রাজনৈতিক মনোবৃত্তিও উগ্রবাদ হয়ে উঠতে পারে।

হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান এবং ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট বলসানারো এই সুযোগে বিরোধিতাকারী প্রান্তিক নৃগোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে নিজেদের দলের উগ্র সমর্থকদের সংগঠিত হতে উসকানি তো দিচ্ছেনই, অর্থসহায়তাও দিচ্ছেন। ট্রাম্প যখনই ‘চাইনিজ ফ্লু’ এবং ‘চীন দায়ী’ অথবা ‘চীনের ষড়যন্ত্র’ ধরনের ঘোষণাগুলো দিয়ে বসলেন, চীনা অভিবাসীরা হামলার শিকার হতে থাকল। ধারাটি আমেরিকা ছাড়িয়ে ইউরোপেও পৌঁছেছে।

আরও-পড়ুনঃ গ্যাস্ট্রিকের সমস্যার আড়ালে আসলে করোনার হানা! চিন্তা বাড়াচ্ছে চিকিত্সকদের

এপ্রিলের ১০ তারিখে সিএনএন উদাহরণসহ একটি রিপোর্ট করেছে যাতে অনলাইনে চীনাদের বিরুদ্ধে ঘৃণা উদগিরণ মারাত্মক রকম বেড়েছে বলে জানানো হয়েছে।

ভারতে তাবলিগি পুণ্যার্থীদের মধ্যে করোনার সংক্রমণ ধরা পড়ার পর অসংখ্য উগ্র হিন্দুত্ববাদী হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ মেসেজের মাধ্যমে জনে জনে মুড়ি-মুড়কির মতো মুসলিমবিরোধী ঘৃণা ছড়ানো শুরু করেছিল। উগ্রবাদ উসকে দিতে ‘করোনা জিহাদ’, ‘তাবলিগি ভাইরাস’ ইত্যাদি তাত্ত্বিক কাঠামোও তৈরি করেছিল তারা। ষড়যন্ত্রতত্ত্বও প্রচারিত হয়েছিল যে, হিন্দুদের হয়ে মোদি কথা বলেছেন, তাই মুসলিমরা এভাবে প্রতিশোধ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

বিভিন্ন স্থানে মুসলমানদের ওপর আক্রমণও বাড়ছিল। স্বাস্থ্য প্রতিবেদক বিদ্যা কৃষ্ণণ একটি টুইটে লিখেছিলেন, ‘তাবলিগে সংক্রমণের খবর হওয়ার পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জরুরি চিকিৎসা রসদ জোগাড়ের বদলে মুসলমানদের দোষারোপের পেছনেই বেশি সময় দিয়েছে।’ এই টুইটের পরিণতিতে তাঁকে অনলাইনে তীব্র সংঘবদ্ধ উগ্রবাদী আক্রমণের শিকার হতে হয়েছিল। অনেক স্থানে মুসলমান রোগীদের যেকোনো ধরনের চিকিৎসাসেবা দিতে অস্বীকার জানানো হচ্ছিল। এপ্রিলের ৭ তারিখে বাধ্য হয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে বিশেষ নির্দেশনা দিয়ে বলতে হয়েছে, ‘ধর্মীয় প্রোফাইলিং বন্ধ করো।’ সংস্থার ইমারজেন্সি রেসপন্স কো-অর্ডিনেটরকে ‘ইট ডাজ’ন্ট হেল্প’ বলে উষ্মাও প্রকাশ করতে হয়েছিল।

গত ২৩ এপ্রিল জেনেভা সেন্টার ফর সিকিউরিটি পলিসির একটি ওয়েবিনারে আলোচিত হয় যে, কুখ্যাত আইসিস সংঘবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করছে। সম্ভবত সদস্য সংগ্রহের চেষ্টাও চালাচ্ছে। ‘জেহাদি জন’ নামের আলোচিত, আইসিসের নির্দয়তম সাইকোপ্যাথ ঘাতকটিও মাস্ক পরার সুযোগ নিয়ে ছদ্মবেশে ইউরোপে ঢুকে পড়েছে। ওয়েবিনারটিতে ড. ক্রিশ্চিনা লিয়াং জানালেন যে উগ্রবাদীরা ‘সফট টার্গেট’ যেমন ধর্মশালা, হাসপাতাল, বিদ্যালয় প্রভৃতি জনসেবামূলক জনসমাগমের স্থানে আক্রমণ চালানোর জন্য শক্তি সঞ্চয় করতে পারে।

আমেরিকায় নব্য নাজিবাদীরাও এই সময়ে অনলাইনে দারুণ সক্রিয়। ড. পিচ্চিলিওনি, তিনি নিজেও ১৪ বছর বয়সে উগ্র নাজিবাদী দল সিএএইচএসে সদস্য হয়ে গিয়েছিলেন, বর্তমানে ‘ফ্রি র‍্যাডিক্যালস প্রজেক্ট’ নামে একটি উগ্রবাদবিরোধী সংগঠন চালান। তাঁর ভাষ্যমতে, এই সময়টিই ‘উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর জন্য মাহেন্দ্রক্ষণ’। উগ্র বামপন্থী দলগুলোও ভয়ানক বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।

এই বছরের ২৬ মার্চের ‘ফরেন পলিসি’ পত্রিকা থেকে জানা যায়, যুক্তরাজ্যের পুলিশ বিভাগের হাতে আসা ধর্মবিরোধী উগ্র বামপন্থীদের একটি পোস্টারে করোনাভাইরাসধারীদের মানব-বোমা হওয়ার জন্য প্রণোদিত করা হয়েছে। পোস্টারটির ভাষ্য এ রকম—‘মসজিদে, সিনাগগে, পার্কে, বাজারে যেখানেই অনেক মানুষ ধর্মীয় সমাবেশ করতে জড়ো হবে, সেখানেই ঢুকে যাও। সংক্রমিত করে দিয়ে আসো সবগুলোকে।’

এই সময়টিই কেন উগ্রবাদ বিস্তারের সবচেয়ে উর্বর সময়? কারণ উগ্রবাদীরা জানে—এক. রাষ্ট্রযন্ত্রের পুরো শক্তি-সম্পদ করোনামুক্তিতে নিবেদিত। এমনকি গোয়েন্দা কার্যক্রমও শিথিল। এই রকম সুযোগ কালেভদ্রে আসে না। দুই. সরকারগুলো নিজেদের ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও ব্যর্থতা ঢাকতে একে-ওকে দোষারোপ করবে। ফলে উগ্রবাদীদের দিকে নজর দেওয়ার বিষয়টি গৌণ হয়ে পড়বে।

তিন. রোগটি নতুন এবং বিচিত্র ও জটিল হওয়ায় এবং উৎস অচিহ্নিত হওয়ায় সব দেশই অগোছালো ও বিশৃঙ্খল থাকবে। মাছ শিকারের জন্য এ রকম ঘোলা পানিই দরকার। চার. যত দিন কার্যকর উপশম না পাওয়া যাচ্ছে, তত দিন মানুষ মানসিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল ও আত্মবিশ্বাসহীন থাকবে। ফলে হাওয়া থেকে পাওয়া তথ্যেও মানুষ বিশ্বাস করতে থাকবে। নতুন নতুন টোটকা, ওষুধ এবং কুচিকিৎসার চর্চাও বাড়বে। তথ্যবিকৃতিও বাড়বে।

আরও-পড়ুনঃ মাছের কোন ভাগটা খেলে স্বাস্থের পক্ষে সবচেয়ে উপকারী হয়?

‘ফরেন পলিসি’ পত্রিকায় জ্যাকসন সোসাইটির উগ্রবাদ গবেষণার আলোকে লেখা হয়, উগ্রবাদীদের পক্ষে এই মুহূর্তে যেকোনো কু-বিদ্যা ও অপতত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারা সম্ভব। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, ‘সমকাম হতে ভাইরাসটি ছড়িয়েছে’ অথবা ‘অন্য কোনো ধর্মের বা গোষ্ঠীর কোনো আচার-অনুষ্ঠানের কারণে ভাইরাসটি ছড়িয়েছে’, এ ধরনের প্রোপাগান্ডা চালানো হলে খুব সহজেই অনেককে বিশ্বাস করানো সম্ভব হবে। উগ্রবাদীরা জানে, তাই তারা বিভিন্ন ধরনের উগ্রবাদকে এভাবেই শক্তিশালী হয়ে ওঠার এবং সদস্য বানানোর জন্য টার্গেট করা যুবা-তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয় হওয়ার সুযোগ নেবে।

বাংলাদেশে উগ্রবাদের সমস্যাটি নতুন নয়। আগেও বেশ কয়েকটি উগ্রবাদী আক্রমণ এবং হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। তা ছাড়া আমাদের দেশটিও ঘনবসতিপূর্ণ। করোনাকালে রাষ্ট্রপক্ষের স্বাভাবিক অসাবধানতাও বড়সড় বিপদ ডেকে আনতে পারে। এই বিপজ্জনক সময়ে করণীয় কী হতে পারে? প্রথম করণীয় হতে পারে দেশের অভ্যন্তরে শিক্ষিত ও দেশপ্রেমিক নাগরিক ও সিভিল সোসাইটির সদস্যদের সহযোগে জনগণের ‘তৃতীয় নয়ন’ তৈরি করা।

সরকারের পক্ষে এই সমস্যা একা সামাল দেওয়া কঠিন দুটি কারণে—এক. রাষ্ট্রের কর্মকৌশল ও গোয়েন্দা ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সংঘবদ্ধ উগ্রবাদীরা ওয়াকিবহাল থাকে এবং সেগুলোকে অকার্যকর করে বা ফাঁকি দিয়েই উদ্দেশ্য সিদ্ধিতে নামে। দুই. আমাদের নিচু রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রেক্ষাপটে দলগুলো হীন দলীয় ও সংকীর্ণ স্বার্থচিন্তার ওপর উঠতে পারে না।

তাই উগ্রবাদী নন এমন অনেক নিরপরাধ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ মিথ্যা উগ্রবাদের অভিযোগে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হতে পারেন। এই অবস্থাটি উগ্রবাদ বিকাশের জন্য সবচেয়ে সহায়ক। জনগণের ‘তৃতীয় নয়ন’ হতে পারে একটি স্বায়ত্তশাসিত মনিটরিং কমিটি, যার সদস্যরা উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখবেন এবং উগ্রবাদের সম্ভাব্য শিকার ব্যক্তি এবং সরকারের জন্যও তথ্যপ্রবাহের উৎস হবেন।

ড. হেলাল মহিউদ্দীন: অধ্যাপক, রাজনীতিবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান; এবং গবেষক, সেন্টার ফর পিস স্টাডিজ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়।

Facebook Comments