increase-memory

স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধিতে করণীয়:

  1. ব্যায়াম ও শারিরীক পরিশ্রম: এর ফলে মস্তিষ্কে স্নায়ুকোষে অক্সিজেন সরবারহ বেশি হয়৷ অক্সিজেন স্নায়ুকোষগুলোকে সজীব রাখে এবং এর ফলে স্নয়ুকোষ দক্ষতার সাথে স্মৃতী ধরে রাখতে সক্ষম হয়৷ স্নায়ুকোষের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি পায়৷ যারা নিয়মিত জিম/ফিজিক্যাল এক্সারসাইজ করেন, তাদের ব্রেইন অপেক্ষাকৃত ভালো কাজ করে৷ তাদের মন সবসময় ভালো থাকে এমনকি, নিয়মিত পরিশ্রম করলে পড়াশুনায় আগ্রহ, মনোযোগ এবং ধারণক্ষমতা সবই বৃদ্ধি পায়৷ বাস্তবে সেটা দেখতে চাইলে সকালে দৌড়/এক্সারসাইজের পর বই পড়ে দেখবেন; কিংবা বিকালে ফুটবল খেলার পর পড়তে বসে দেখবেন, পড়ার গতিতে কোনো উন্নতি হয় কিনা৷ অনেকে বলবে, এটা শুধু মনের একটা অনুভুতি৷ আপনি মনে মনে চিন্তা করছেন যে পড়াশুনা ভালো হচ্ছে, সেজন্যই আপনার পড়াশুনা ভালো হচ্ছে৷ এগুলো বাজে কথা৷ বরং, নিজেই সত্যটা উপলব্ধি করুন৷
  2. ডায়েট: ভিটামিন বি কমপ্লেক্স সমৃদ্ধ খাবারগুলো বিশেষভাবে ভিটামিন বি৬, বি১২, ফলিক এসিড, বায়োটিন, এগুলো স্নায়ুকোষের মায়োলিন আবরণ তৈরীতে সাহায্য করে৷
এটি একটি স্নায়ুকোষ৷ যার প্রতিকী ছবি নিচে: ডায়াগ্রাম পিকচার৷
ছবিতে Schwann cell (Myelin sheath) বা মায়োলিন আবরণ দেখানো হয়েছে৷ স্নায়ুকোষ – উইকিপিডিয়া

স্নায়ুকোষের লেজ (Axon) দিয়ে তথ্য/সংকেত (nerve impulse) পরিবহনের জন্য এই আবরণটি গুরুত্বপূর্ণ৷

ভিটামিনের ভিতর ভিটামিন বি১২ ব্রেইনের জন্য সবথেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, যদিও সকল ভিটামিন কমবেশি দরকার৷

সুতরাং, ভিটামিন বি সমৃদ্ধ খাবার বেশি খেতে হবে৷ প্রয়োজনবোধে ভিটামিন বি কমপ্লেক্স ওষুধ খাওয়া যেতে পারে৷

উল্লেখ্য, অতিরিক্ত প্রোটিন জাতিয় খাবার মস্তিস্ককে দুর্বল করে এবং মস্তিস্কের কার্যক্ষমতা কমায়৷ যারা প্রোটিন খান, তাদের স্মরণশক্তি যারা শাকসবজি বেশি খান, তাদের তুলনায় কম৷ অতিরিক্ত প্রোটিন রক্তে অ্যামোনিয়াম(NH4+) এর পরিমাণ বৃদ্ধি করে যা স্নায়ুতন্তু (Axon) দিয়ে বৈদ্যুতিক সংকেত পরিবহন বাধাগ্রস্থ করে এবং স্নায়ুকোষের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয়৷

3. মস্তিষ্কের ব্যায়াম: নিয়মিত পড়াশুনা করুন৷ প্রতিদিনই চেষ্টা করুন নতুন কিছু মুখস্থ করতে৷ পুরাতন কেনো পড়া বই না দেখে মনে করতে চেষ্টা করুন৷ শরীরের এক্সারসাইজ এর মত ব্রেইনের এক্সারসাইজ হল মুখস্থ করা, এতে আপনার মুখস্থ করার ক্ষমতা বাড়বে; এবং পুরাতন বিষয় স্মরণ করা, এতে আপনার স্মরণ শক্তি বাড়বে৷ আপনি দীর্ঘদিন পড়াশুনা থেকে দুরে থাকলে দেখবেন, আগে যতটা সহজে মুখস্থ করতে পারতেন, এখন ততটা সহজে হচ্ছেনা৷ আবার নিয়মিত পড়াশুনা শুরু করলে এ অবস্থা কেটে যাবে৷

এই তিনটি বিষযই স্মৃতি বৃদ্ধির মূলমন্ত্র, যা নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি৷ আর হ্যাঁ, মধু খেতে অবশ্যই ভুলবেননা৷ নিয়মিত মধু পান করুন৷ কারণ, এর পুষ্টিগুণ দুনিয়ার যেকোনো খাবারের থেকে বেশি৷

আরও-পড়ুনঃ গ্যাস্ট্রিকের সমস্যার আড়ালে আসলে করোনার হানা! চিন্তা বাড়াচ্ছে চিকিত্সকদের

এছাড়াও কিছু করনীয় রয়েছে, যেমন:

  • অপ্রয়োজনীয় কাজ থেকে বিরত থাকুন: মোবাইল বা কম্পিউটারে প্রসেসর যে কাজ করে, মানুষের দেহে মস্তিষ্ক সেই কাজ করে৷ সেই সাথে RAM এবং ROM এর কাজও করে৷ সুতরাং, মস্তিষ্কের দক্ষতার জন্য অপ্রয়োজনীয় সব কাজ থেকে বিরত থাকুন৷ তাতে মস্তিষ্কের উপর চাপ কমবে এবং আপনি প্রয়োজনীয় কাজে ভালোভাবে মাথা খাটাতে সক্ষম হবেন৷
ছবি: প্ররসেসর

আশ্চার্য হলেও সত্য, মানুষের ব্রেইনও প্রায় পুরোপুরিই এই প্রসেসরের মত কাজ করে৷

এখানে স্নায়ুকোষের সংযোগ জাল দেখতে পাচ্ছেন; ঠিক যেমনটি প্রসেসরেে সংযোগ জাল রয়েছে৷ এমনকি মানুষের স্নায়ুকোষও বৈদ্যুতিক সংকেত বা কারেন্টের সাহায্যে কাজ করে৷ আসল কথা হল, প্রসেসর (CPU) এগুলো মানুষের ব্রেইনের অনুকরণেই তৈরী হয়েছে৷

মোবাইল ফোনে যখন আপনি বেশি কাজ করেন, তখন গরম হয়, হ্যাং করে, মানুষের মাথাও তেমনি৷ আবার, মোবাইল ফোনের স্পীড বুস্ট করার জন্য আপনি যেমন জাংক ফাইল পরিষ্কার করেন, RAM ক্লিন করেন, প্রয়োজনে কম দরকারী অ্যাপগুলো আনইনস্টল করে দেন; ব্রেইনের দক্ষতার জন্য ঠিক তেমনি করতে হবে৷ যে কাজগুলো দৈনন্দিন জীবনে আপনাকে ঝামেলায় ফেলে, তা নিয়ে আপনার বাড়তি দুশ্চিন্তা করতে হয়, সেগুলো পরিহার করুন৷ আপনি বই পড়ার সময় খেয়াল করবেন, নানান রকম কথা মাথায় আসে, তার জন্য পড়ার মনোযোগ কমে যায়৷ যাার চিন্তা আপনার পড়ায় ব্যাঘাত ঘটায়, সেই বিষয়টাই পুরোপুরি পরিহার করুন৷ এ চিন্তা হতে পারে ফেসবুক, ভিডিও গেম, সিনেমা, গান, রিলেশন, কিংবা ঝগড়া বিবাদ, হিংসা, দ্বন্ধ, ইত্যাদি৷ কখনো কখনো এগুলো এত বাজে আকার ধারণ করে যে, এগুলো আপনার পড়াশুনাকে পুরোপুরিই থামিয়ে দিবে৷

আরো-পড়ুনঃ গ্যাস্ট্রিকের সমস্যার আড়ালে আসলে করোনার হানা! চিন্তা বাড়াচ্ছে চিকিত্সকদের

  • একঘেয়েমি কীভাবে দুর করবেন: পড়তে পড়তে একঘেয়েমি চলে আসলে একটু বিরতি দিয়ে আবার পড়তে পারেন৷ অনেকেই ভাববে, অনেক পড়লাম, এখন একটু গান শুনি৷ কিন্তু, সময় এবং ব্রেইনের সদ্ব্যবহার করতে চাইলে আমি বলব, ফিজিক্স অনেক পড়েছেন, এখন একটু সাধারণ জ্ঞান পড়ুন৷ কিংবা, বাংলা/ইংরেজি অনেক পড়েছেন, এখন একটু অংক করুন৷ আপনার পড়াশুনাও চলবে, আবার একঘেয়েমিও দুর হবে৷
  • পড়াশুনায় আগ্রহ তৈরী করতে চেষ্টা করুন: নিজেকে মোটিভেশন (Self motivation) দিয়ে পড়াশুনার প্রতি আগ্রহ তৈরী করুন এবং আকর্ষণ বৃদ্ধি করতে চেষ্টা করুন৷ উদাহরণ স্বরূপ: আপনার মনকে বুঝাতে চেষ্টা করুন পড়াশুনার ভিতর অনেক মজা, অনেক বিনোদন৷ যে জিনিস আগ্রহ নিয়ে করা হয়না, তাতে মনোযোগ আসেনা৷ আমি যখন নিজেকে পড়াশুনায় বসাতে পারতামনা, তখন হলে থাকা অন্যান্য বন্ধুদের রুমে উঁকি দিয়ে তাদের পড়াশুনা দেখতাম৷ সেটা মোটামুটি কাজে লাগতো৷ যাই হোক, সেল্ফ মোটিভেশন আরো অনেকভাবেই হতে পারে৷
  • পড়াশুনা যেটুকু করছেন, তা বুঝে মুখস্থ করুন এবং চিন্তাভাবনা করে পড়ুন: যেটা পড়ছেন, সেটা নিয়ে চিন্তাভাবনা করুন৷ বইয়ের একটা কথার সাথে অন্য কথার সম্পর্ক খুজতে চেষ্টা করুন; যাকে বলা হয় ‘কোরিলেট করে পড়া’৷ বিজ্ঞানমনস্কতা নিয়ে পড়ুন; ‘কেন’, ‘কীভাবে’ এজাতীয় প্রশ্ন করুন এবং নিজেই উত্তর খুজতে চেষ্টা করুন৷ এর ফলে আপনার চিন্তাভাবনা করার ক্ষমতা বাড়বে৷ আমি এমন ছাত্র দেখেছি, সারা জীবন মুখস্থ করে পড়াশুনা করেছে; সে মুখস্থ করতে পারে সহজেই, কিন্তু, তার মর্মার্থ উদ্ধারে সে ব্যার্থ!
  • মন ফ্রেশ রাখতে বদ্ধ/অন্ধকার ঘর পরিহার করে সূর্যের আলোময় খোলামেলা পরিবেশে থাকুন এবং পড়াশুনার জন্যও এমন পরিবেশ বেছে নিন৷

স্মৃতিশক্তি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা: সূচনা ও বিকাশ

একজন নবজাতকের ব্রেইনে প্রায় ১০০ বিলিয়ন নিউরণ থাকে৷ কিন্তু, মানুষের জীবন যাপনের জন্য কয়েক বিলিয়ন নিউরণই যথেষ্ট৷ মানুষের স্মৃতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ আরেকটা বিষয় হল, নিউরনগুলোর মধ্যকার আন্তসংযোগ ( Synapse)৷ Synapse যত বেশি হবে, প্রতিটা নিউরন একে অপরের সাথে তত ভালো যোগাযোগ রক্ষা করতে পারবে৷ ফলে স্মৃতি তত বেশি শক্তিশালী হবেে৷ কিন্তু, বয়সের সাথে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সিন্যাপস বা আন্তসংযোগগুলো বিলীন হয়ে যায়৷ জন্মের সময় Synapse থাকে প্রায় 50 ট্রিলিয়ন৷ 3-5 বছর বয়সে সিন্যাপস থাকে 1000 ট্রিলিয়ন৷ তারপর কমে ১৪ বছরে সিন্যাপস থাকে প্রায় 100 ট্রিলিয়ন৷ সিন্যাপসের সংখ্যাটা নির্ভর করে আপনার ব্রেইন ছোট বয়সে আপনি কীভাবে ব্যবহার করছেন, কতটা ব্যবহার করছেন, তার উপর৷ আগেই বলেছি, “অপ্রয়োজনীয়” সিন্যাপসগুলো বিলীন হয়ে যায়৷ সুতরাং, আপনি ছোটবেলায় যদি ব্রেইনের কাজ বেশি করে থাকেন, তখন আপনি বেশি পরিমাণ নিউরণকে বাঁচিয়ে রাখতে সক্ষম হবেন এবং তাদের মধ্যে বেশি পরিমাণ সংযোগ জাল Synapse থাকবে৷ ফলে ব্রেইন অধিক শক্তিশালী হবে৷

ছবিটিতে বয়সের সাথে সাথে নিউরনের সংখ্যা হ্রাস দেখানো হয়েছে৷

একারণেই ছোটবেলা/শৈশবকে বলা হয় মানসিক বিকাশের সময়৷ শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশে এই বয়সে বিশেষ পরিচর্যা করা খুবই দরকারি৷

আরো-পড়ুনঃ মাছের কোন ভাগটা খেলে স্বাস্থের পক্ষে সবচেয়ে উপকারী হয়?

Facebook Comments