Plasma therapy

প্লাজমা থেরাপির মাধ্যমে একজনের শরীরের কার্যকর অ্যান্টিবডি অন্যদের শরীরে স্থানান্তর করা হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানে এটি বেশ পুরোনো একটি পদ্ধতি।এই পদ্ধতিতে সাধারণত কোন ভাইরাল সংক্রমণ থেকে সেরে ওঠা মানুষের রক্ত সংগ্রহ করা হয়। এরপর সেই রক্ত সঞ্চালিত করা হয় একই ধরনের ভাইরাল সংক্রমণের শিকার রোগীর দেহে।

১৯১৮ সালে স্প্যানিশ ফ্লুর মহামারি এবং ১৯৩০ এর দশকে হামের চিকিৎসায় এই পদ্ধতি কাজে লাগানো হয়েছিল। একেবারে সাম্প্রতিক সময়ে ইবোলা, সার্স এবং ‌’এইচ-ওয়ান-এন-ওয়ান’ এর মতো রোগের চিকিৎসায়ও এটি ব্যবহার করা হয়েছে।

প্লাজমা কি !

মানুষের রক্তের জলীয় অংশকে বলা হয় প্লাজমা বা রক্তরস। রক্তের মধ্যে প্রায় ৫৫ ভাগই থাকে হলুদাভ রঙের জলীয় পদার্থ এই প্লাজমা। এতে থাকা গুরুত্বপূর্ণ পদার্থ হলো পানি, এন্টিবডি, এনজাইম, অনেক গ্রোথ ফ্যাক্টর এবং খনিজ লবণ। রক্তের বাকি ৪৫ ভাগ হলো রক্তকণিকা।

যারা রক্তদান করেন , তারা প্লাজমা ও রক্ত কণিকা উভয় দেন কিন্তু প্লাজমা দাতারা কেবল প্লাজমা ই দেন, রক্তক্ষসমূহ ফেরত চলে যায় বিশেষ প্রক্রিয়ায়। সম্পুর্ন ব্যথাহীন কাজ । প্লাজমা দানের পর কিছু জল পান করলেই একঘন্টায় ক্ষতি পুষিয়ে যায়।

প্লাজমা থেরাপি কি!

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পরে যারা পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠেছেন, তাদের শরীরে এক ধরণের অ্যান্টিবডি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার উপাদান তৈরি হয়।

তাদের শরীর থেকে প্লাজমার মাধ্যমে সংগ্রহ করা এই অ্যান্টিবডি যদি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত কোন ব্যক্তির শরীরে প্রয়োগ করা হয়, তখন তার শরীরের সেই অ্যান্টিবডি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়। তখন তিনিও সুস্থ হয়ে ওঠেন।

চিকিৎসক কর্তৃক করোনাজয়ী একজনের শরীর থেকে প্লাজমা বা রক্তরস সংগ্রহ করে করোনাভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে প্রয়োগ করার প্রক্রিয়া হলো প্লাজমা থেরাপি ।

এন্টিবডি কীভাবে কাজ করে!

প্লাজমায় অনেক ধরণের অ্যান্টিবডি থাকে। যখন কেউ কোন রোগে আক্রান্ত হন, তখন সেই ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি প্রোটিন তৈরি হয়। ওই প্রোটিন জীবাণুর চারপাশে এক ধরনের আবরণ তৈরি করে সেটাকে অকেজো করে ফেলে। এভাবেই অ্যান্টিবডি কাজ করে।

প্লাজমায় কতটা অ্যান্টিবডি রয়েছে সেটা পরীক্ষা করে দেখা যায়। সেটার জন্য একটা বিশেষ রিএজেন্ট ব্যবহার করতে হয়

কীভাবে দেয়া হবে প্লাজমা থেরাপি

একজন সুস্থ রোগীর শরীর থেকে সংগ্রহ করা প্লাজমা দুই থেকে তিনজন অসুস্থ রোগীকে দেয়া সম্ভব হয়।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ইউনিটে ভর্তি থাকা ৪৫ জনের শরীরে প্রয়োগ করা হবে। গুরুতর অসুস্থ বা মুমূর্ষু রোগীদের , বিশেষ করে যাদের শ্বাসকষ্ট রয়েছে, রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে গেছে, এমন রুগীদের ক্লিনিকেল ট্রায়ালের অংশ হিসেবে দেয়ার কথা আছে ।

আরও-পড়ুনঃ গ্যাস্ট্রিকের সমস্যার আড়ালে আসলে করোনার হানা! চিন্তা বাড়াচ্ছে চিকিত্সকদের

আইসিইউতে নেয়ার আগে এই থেরাপির প্রয়োগ করা গেলে ভালো ফলাফল আসতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র, চীন, সৌদি আরব, ভারত, মালয়েশিয়াসহ অনেক দেশে সফলভাবে প্লাজমা থেরাপির প্রয়োগ করা হয়েছে। সেখানে সাফল্যের হার বেশ ভালো। এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন প্লাজমা থেরাপি প্রয়োগের অনুমতি দিয়েছে।

কেন এই প্লাজমা থেরাপি!

নভেল করোনা ভাইরাসে এ পর্যন্ত পৃথিবীতে পঞ্চাশ লক্ষের মতো মানুষ আক্রান্ত ও ৩ লক্ষাধিক মৃত্যুবরণ করেছে। বাংলাদেশে ও করোনা শনাক্ত ২২ হাজার ছাড়ালো, মৃত্যু ৩২৮। কিন্তু জটিল রুগীদের চিকিৎসায় কার্যকর কোন ঔষধ ও নেই এবং টিকা এখনো আবিষ্কৃত হয়নি।

তাই আপাতত এই চিকিৎসার ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বা পরীক্ষামূলক প্রয়োগ করা হচ্ছে প্লাজমা থেরাপি । সফলতা পাওয়া গেলে করোনাভাইরাস রোগীদের চিকিৎসায় এটি পুরোদমে শুরু হবে।

আরও-পড়ুনঃ মাছের কোন ভাগটা খেলে স্বাস্থের পক্ষে সবচেয়ে উপকারী হয়?

দেশের প্রথম প্লাজমা দাতা:

বাংলাদেশের প্রথম প্লাজমাদাতা ডাঃ দিলদার হোসেন বাদল , যিনি আরো একজন চিকিৎসক ডাঃ রওনক জামিল , কোভিড19 রোগ থেকে আরোগ্যলাভ করে গত সপ্তাহে প্লাজমা দান করেছেন। তাঁর এই প্লাজমা দিয়ে অন্তত দুজন রুগীর সেবা করা যাবে। তাঁকে দেখে আর সুস্থ্য অনেকে প্লাজমা দানে আগ্রহী হয়েছেন।

Facebook Comments